মূল কনটেন্টে যান
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
শিরোনাম
Daily Citizen of Bangladesh

নাগরিকের পাঠানো খবর,
সাংবাদিকের যাচাই শেষে প্রকাশ

চাকরি নয় বাংলাদেশকে বদলে দিতে পারে স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন বিপ্লব

বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যখন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, কিংবা জেলা শহরের কোনো তরুণী যখন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসাকে বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন, তখন একটি নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা জন্ম নেয়।

মীর হাসিব মাহমুদ, ঢাকা

প্রকাশ:
কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনছে আধুনিক স্টার্টআপ সংস্কৃতি।

কিন্তু সম্ভাবনা আর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার মধ্যবর্তী পথটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত। সেখানে প্রয়োজন পরীক্ষার সুযোগ, অর্থায়ন, দক্ষ সহযোগী, প্রথম ক্রেতা এবং সহায়ক প্রতিষ্ঠান। এই সংযোগগুলো অনুপস্থিত থাকলে ভালো ধারণাও হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের সামনে তাই বড় প্রশ্ন হলো, তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের উদ্যোগ টিকিয়ে রাখার পরিবেশ আমরা কতটা তৈরি করতে পারছি?

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সামাজিক সাফল্যের পরিচিত মানদণ্ড হচ্ছে ভালো ফলাফল, সম্মানজনক ডিগ্রি এবং নিরাপদ চাকরি। এই আকাঙ্ক্ষা অস্বাভাবিক নয়; পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির সব সম্ভাবনাকে কেবল বিদ্যমান চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন পণ্য এবং নতুন বাজার তৈরি না হলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও যথেষ্ট সম্প্রসারিত হয় না। উদ্যোক্তা তৈরির আলোচনা তাই ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় ছাড়িয়ে জাতীয় উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন। বাংলাদেশকে এমন পরিবেশ নির্মাণ করতে হবে, যেখানে সমস্যা শনাক্ত করা থেকে তার কার্যকর সমাধান বিক্রি করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

স্টার্টআপ বলতে অবশ্য সব নতুন ব্যবসাকে বোঝানো হয় না। সাধারণভাবে স্টার্টআপ এমন উদ্যোগ, যা অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্ভাবনী ও সম্প্রসারণযোগ্য ব্যবসার মডেল খুঁজে বের করে। একটি স্থানীয় ব্যবসার অবদানও গুরুত্বপূর্ণ; তবে স্টার্টআপের বিশেষ সম্ভাবনা হলো একই সমাধান বহু গ্রাহক, অঞ্চল কিংবা দেশে পৌঁছে দেওয়া। এই উদ্ভাবন শুধু মোবাইল অ্যাপ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সীমিত নয়। সাশ্রয়ী কৃষিযন্ত্র, নতুন খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা, শিল্পকারখানার বর্জ্য পুনর্ব্যবহার কিংবা স্বল্প খরচে সেবা পৌঁছানোর পদ্ধতিও এর ভিত্তি হতে পারে। ফলে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উন্নয়নের অর্থ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

একটি কার্যকর ইকোসিস্টেমে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরি করে, উদ্যোক্তা সেই জ্ঞানকে বাস্তব সমস্যায় প্রয়োগ করেন, বিনিয়োগকারী প্রয়োজনীয় ঝুঁকিপুঁজি দেন এবং বাজার সমাধানের কার্যকারিতা যাচাই করে। সরকার ন্যায্য নিয়ম ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে। অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠাতারা নতুনদের ভুল কমাতে সাহায্য করেন, আর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো ক্রেতা ও সহযোগী হিসেবে পাশে দাঁড়ায়। এই সম্পর্ক যত কার্যকর হয়, উদ্যোগের শুরুতে ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তত কমে। তখন উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কেবল বিত্তবান পরিবার বা প্রভাবশালী পরিচিতি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দক্ষতা ও সমস্যার গভীর বোঝাপড়াও সামনে আসার শক্তি পায়।

বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যাগুলোর মধ্যেই উদ্ভাবনের বড় ক্ষেত্র রয়েছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, পণ্য পরিবহনে অপচয়, ছোট ব্যবসার হিসাব ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মানসম্মত শিক্ষার অসম সুযোগ কিংবা শিল্পে জ্বালানির অদক্ষ ব্যবহার—প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে মানুষের ব্যয় ও অর্থনীতির ক্ষতি জড়িত। কোনো উদ্যোগ যদি এই ব্যয় কমাতে পারে এবং গ্রহণযোগ্য মূল্যে সেবা দিতে পারে, তাহলে তার বাজার তৈরির সম্ভাবনা থাকে। তবে সমস্যা বড় হলেই ব্যবসা সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কার সমস্যা, কে সমাধানের মূল্য দেবে এবং প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় নতুন পদ্ধতি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শুরুতেই।

এখানেই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির সরাসরি সম্পর্ক। শিক্ষার্থীরা যদি বাস্তব গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা, তথ্য সংগ্রহ, নমুনা পণ্য তৈরি এবং ফলাফল যাচাই করার অভিজ্ঞতা পান, তাহলে উদ্ভাবন তাদের কাছে পরীক্ষাযোগ্য কাজ হয়ে উঠবে। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী প্রকৌশলের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করতে পারেন; কৃষিবিজ্ঞানের গবেষক যুক্ত হতে পারেন বিপণন ও সফটওয়্যার দক্ষতার সঙ্গে। এ ধরনের সহযোগিতা সমস্যাকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে সাহায্য করবে। উদ্যোক্তা শিক্ষার মূল্য তখনই তৈরি হবে, যখন শিক্ষার্থী সুন্দর উপস্থাপনার পাশাপাশি গ্রাহকের আপত্তি শুনতে এবং নিজের ধারণা সংশোধন করতে শিখবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থাও জরুরি। গবেষণাগারে কার্যকর কোনো প্রযুক্তি তৈরি হলেও সেটিকে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপ দিতে নকশা, উৎপাদন, মান যাচাই এবং বিপণনের কাজ করতে হয়। গবেষকের একার পক্ষে সব দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সহায়তা থাকা প্রয়োজন, যা গবেষককে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সম্ভাব্য উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যুক্ত করবে। গবেষণার মালিকানা এবং বাণিজ্যিক আয় ভাগাভাগির শর্তও স্পষ্ট হওয়া দরকার। এতে গবেষক জানবেন তার অবদানের স্বীকৃতি কীভাবে মিলবে, আর উদ্যোক্তা বুঝবেন কোন শর্তে প্রযুক্তিটি নিয়ে ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন।

বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এই সংযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। OECD-এর বাংলাদেশের উৎপাদন রূপান্তরবিষয়ক পর্যালোচনায় বেসরকারি খাতে উদ্ভাবনে সীমিত বিনিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোগের যৌথ গবেষণা, নমুনা পরীক্ষা এবং প্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। উদাহরণ হিসেবে, কোনো কারখানা তার উৎপাদনজনিত নির্দিষ্ট সমস্যা নতুন উদ্যোক্তাদের সামনে তুলে ধরতে পারে। উদ্যোক্তারা সমাধান পরীক্ষা করবেন এবং সফল হলে বাণিজ্যিক চুক্তি পাবেন। এতে গবেষণার লক্ষ্য স্পষ্ট হবে এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে বাস্তব চাহিদার দূরত্ব কমবে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উদ্যোগের বিভিন্ন পর্যায়ের চাহিদা বুঝতে হবে। প্রাথমিক ধারণা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ছোট অঙ্কের সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা সম্প্রসারণের বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। পণ্য তৈরির আগেই নিয়মিত কিস্তির দায় চাপলে উদ্যোক্তা পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সময় হারাতে পারেন। আবার গ্রাহক ও আয় তৈরি হওয়ার পর শুধু অনুদানের ওপর নির্ভর করাও যথাযথ নয়। ধারণা যাচাইয়ে প্রতিযোগিতামূলক অনুদান, প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকিপুঁজি এবং ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী পরবর্তী অর্থায়নের সুযোগ থাকলে উদ্যোক্তা উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত অর্থ পেতে পারেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্বাচন ও মূল্যায়ন স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।

বিনিয়োগের মোট অঙ্ক দেখেই ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্য বিচার করা তাই যথেষ্ট নয়। Startup Bangladesh-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিনিয়োগ পর্যালোচনা অনুযায়ী, ওই বছর বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ১২টি চুক্তিতে মোট ১২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসে। এই তথ্যের পাশাপাশি দেখতে হবে, কতজন নতুন প্রতিষ্ঠাতা প্রথম বিনিয়োগ পেয়েছেন, কত ধরনের খাত অর্থায়নের সুযোগ পেয়েছে এবং কত উদ্যোগ পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছেছে। অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ভিত্তি কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, তার উত্তর পেতে আরও গভীরে যেতে হবে।

দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বোঝাপড়ার ঘাটতি দূর করতে হবে। স্টার্টআপে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বেশি, ফল পেতে সময় লাগে এবং সব উদ্যোগ সফল হয় না। এই বাস্তবতা না বুঝে দ্রুত লাভের প্রত্যাশা নিয়ে বিনিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠাতা ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের যৌথভাবে উদ্যোগ যাচাই, প্রতিষ্ঠাতার সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং ব্যবসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও হিসাব, মালিকানার কাঠামো এবং বিনিয়োগের শর্ত বুঝতে হবে। আস্থার ভিত্তি তৈরি হয় যখন উভয় পক্ষ প্রত্যাশা ও দায়িত্ব সম্পর্কে শুরু থেকেই স্পষ্ট থাকেন।

তবে অর্থ পেলেই বাজার তৈরি হয় না। নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম কয়েকজন অর্থপ্রদানকারী ক্রেতা পাওয়া প্রায়ই সবচেয়ে কঠিন কাজ। সম্ভাব্য গ্রাহক জানতে চান, আগে কে পণ্যটি ব্যবহার করেছেন; অথচ আগের ব্যবহারকারী না থাকায় নতুন প্রতিষ্ঠান সুযোগ পায় না। এই বাধা দূর করতে বড় কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং সরকারি সংস্থা সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করতে পারে। নির্দিষ্ট সমস্যা, নির্ধারিত সময় এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে পরীক্ষা হলে উভয় পক্ষের ঝুঁকি কমে। সফল পরীক্ষা উদ্যোক্তাকে আয়, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পরবর্তী গ্রাহকের কাছে যাওয়ার প্রমাণ দেয়।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবটিও এই যুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রতিষ্ঠানকে যাচাই ছাড়াই সুবিধা দেওয়া হলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বড় পূর্ববর্তী কাজের শর্ত থাকলে কার্যকর নতুন সমাধান পরীক্ষার বাইরে থেকে যায়। তাই প্রযোজ্য আইন ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে ছোট পরিসরের উদ্ভাবন পরীক্ষা এবং সফল ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ক্রয়ের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্বাচনের মানদণ্ড, পরীক্ষার ফল এবং ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। এতে সরকারি সমস্যাও উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থবহ উদ্ভাবনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা উদ্যোক্তার টিকে থাকাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নিবন্ধন, অনুমোদন, করসংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া যত দুর্বোধ্য হবে, প্রতিষ্ঠাতার সময় তত বেশি মূল ব্যবসা থেকে সরে যাবে। তাই সহজ ভাষায় নির্দেশনা, প্রয়োজনীয় নথির স্পষ্ট তালিকা এবং সেবা পাওয়ার নির্ভরযোগ্য সময়সীমা দরকার। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজনও কমতে পারে। বিধি সহজ করার পাশাপাশি তার ধারাবাহিক প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী উভয়েই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ চান।

নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আগাম যোগাযোগের সুযোগও থাকা দরকার। আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্য কিংবা ব্যক্তিগত তথ্যনির্ভর পণ্যে ভুলের ক্ষতি বড় হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা, ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং তদারকির অধীনে পরীক্ষার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যায়। পরীক্ষার উদ্দেশ্য হবে প্রযুক্তির সুফল ও ঝুঁকি বোঝা, যাতে উপযুক্ত নিয়ম তৈরি করা সম্ভব হয়। উদ্যোক্তা তখন অনুমানের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন কাজ না করে শুরুতেই প্রয়োজনীয় শর্ত জানতে পারবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের পথকে আরও পরিষ্কার করবে।

ইকোসিস্টেমকে রাজধানীর বাইরেও কার্যকর করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানুষের সমস্যা, উৎপাদনের ধরন এবং বাজারের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। উপকূলের লবণাক্ততা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, পর্যটনসেবা কিংবা স্থানীয় কারিগরদের বাজারসংযোগ নিয়ে সেখানকার উদ্যোক্তার বিশেষ অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। কিন্তু অভিজ্ঞতাকে প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে দক্ষতা, পরীক্ষাগার ও পরামর্শ প্রয়োজন। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে সেই সহায়তা কাছাকাছি পাওয়া সম্ভব। আঞ্চলিক উদ্যোগকে মূল্যায়ন করার সময় রাজধানীর পরিচিত ব্যবসার অনুকরণ করার চাপ থেকেও বের হতে হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে তাদের বাস্তব প্রতিবন্ধকতা বুঝতে হবে। পারিবারিক দায়িত্ব, নিরাপদ যাতায়াত, পেশাগত যোগাযোগে প্রবেশ এবং বিনিয়োগকারীর সামনে নিজের ব্যবসা তুলে ধরার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। তাই সহায়তার সময়সূচি, পরামর্শদাতার প্রাপ্যতা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় পক্ষপাত আছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন। একইভাবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিষ্ঠাতা কয়েক মাস বিনা আয়ে কাজ করার সামর্থ্য না-ও রাখতে পারেন। সীমিত মেয়াদের জীবনধারণ সহায়তা বা গবেষণা অনুদান তাদের পরীক্ষার সুযোগ দিতে পারে। এতে ভালো ধারণার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পারিবারিক সম্পদের প্রভাব কিছুটা কমবে।

আরও একটি মৌলিক শর্ত হলো ব্যর্থতা সম্পর্কে পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি। উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিটি ব্যর্থতাকে সামাজিক অযোগ্যতা হিসেবে দেখলে মানুষ ঝুঁকি নিতে ভয় পাবেন। বাজার যাচাই করে কোনো ধারণা বন্ধ করার সিদ্ধান্তও দায়িত্বশীল হতে পারে। তবে সততার সঙ্গে করা ব্যর্থ চেষ্টা এবং অর্থের অপব্যবহারকে একভাবে দেখা চলে না। স্বচ্ছ হিসাব, গ্রাহকের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বিনিয়োগকারীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ উদ্যোক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখে। একটি ব্যর্থ উদ্যোগ থেকে শেখা প্রতিষ্ঠাতা পরবর্তী সময়ে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন, যদি ফিরে আসার সুযোগ থাকে।

প্রযুক্তি তৈরির দক্ষতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোও সমান প্রয়োজন। ভালো পণ্য থাকা সত্ত্বেও ভুল মূল্য নির্ধারণ, দুর্বল বিক্রয়ব্যবস্থা কিংবা নগদ অর্থের সংকটে ব্যবসা বন্ধ হতে পারে। ফলে উদ্যোক্তা সহায়তায় হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা, দল গঠন ও বিক্রয়ের বাস্তব অনুশীলন থাকতে হবে। অন্যদিকে সফল স্টার্টআপ কেবল প্রতিষ্ঠাতার জন্য সুযোগ তৈরি করে না; দক্ষ কর্মী, সরবরাহকারী এবং সহযোগী ব্যবসারও চাহিদা বাড়ায়। উদ্যোক্তা উন্নয়নকে তাই কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। তবে সবাইকে উদ্যোক্তা হওয়ার চাপ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ বাংলাদেশি উদ্যোগের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে পারে। স্থানীয়ভাবে প্রমাণিত কোনো সমাধান একই ধরনের সমস্যায় থাকা অন্য দেশেও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য ভাষাগত দক্ষতা, মান নিয়ন্ত্রণ, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং গ্রাহকের আস্থা প্রয়োজন। প্রবাসী পেশাজীবীরা সম্ভাব্য ক্রেতার পরিচয়, খাতভিত্তিক পরামর্শ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা দিতে পারেন। এই যোগাযোগকে ফলপ্রসূ করতে নির্দিষ্ট পণ্যের উপযুক্ত বাজার খুঁজে বের করতে হবে। বিদেশে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা পরীক্ষা, বিক্রয়চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় রূপ নেবে।

ইকোসিস্টেম উন্নয়নের নামে আয়োজন বাড়লেও ফলাফল যাচাই ছাড়া প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা কঠিন। কতটি প্রশিক্ষণ হলো, কতজন নিবন্ধন করলেন কিংবা কত পুরস্কার দেওয়া হলো—এসব কার্যক্রমের হিসাব। এর পাশাপাশি জানতে হবে, সহায়তা পাওয়া উদ্যোগগুলোর কতটি নিয়মিত গ্রাহক পেয়েছে, আয় বাড়িয়েছে এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। যে সমাধান কৃষকের সময় বাঁচানোর দাবি করে, তার ফল মাঠপর্যায়ে যাচাই করা দরকার। যে উদ্যোগ নারীর আয় বাড়ানোর কথা বলে, তার প্রমাণও প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে কার্যকর সহায়তা সম্প্রসারণ এবং অকার্যকর কর্মসূচি সংশোধন করা সহজ হবে।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উন্নয়নের চূড়ান্ত অর্থ হলো মানুষের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া। একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা, একজন কৃষকের অভিজ্ঞতা কিংবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পর্যবেক্ষণ থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান জন্ম নিতে পারে, যদি প্রয়োজনীয় সংযোগগুলো কাজ করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সহযোগিতাকে কার্যকর করা এবং উদ্যোক্তার দায়িত্ব আস্থা অর্জন করা। আমরা যদি তরুণদের শুধু স্বপ্ন দেখতে বলেই থেমে না যাই, তাদের পরীক্ষার জায়গা, প্রথম বাজার এবং আবার চেষ্টা করার সুযোগ দিই, তাহলে বাংলাদেশ নতুন উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির নিজস্ব ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবে।

লেখকঃ মীর হাসিব মাহমুদ। সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়। সিইও, লিড নেশন একাডেমী।

সংবাদটি শেয়ার করুন