ডিগ্রি নয়, দিকনির্দেশনা ও উদ্ভাবনেই গড়বে আগামীর বাংলাদেশ, শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে এবং নিজের ক্যারিয়ার গড়তে এখনই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন
বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরির প্রস্তুতি নেবে না, বরং নিজের যোগ্যতা, আগ্রহ ও সম্ভাবনা বুঝে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে শিখবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা কাজ করেছে—ভালো ফলাফল, একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এবং একটি ভালো চাকরি মানেই সফল জীবন। কিন্তু পরিবর্তিত অর্থনীতি, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং কর্মবাজারের প্রতিযোগিতা সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এখন শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, আর্থিক সচেতনতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা।
একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যা শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনাকে অল্প বয়স থেকেই বিকশিত করবে এবং তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় কার্যকর দিকনির্দেশনা দেবে। কারণ, প্রত্যেক শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হবে না, প্রত্যেক শিক্ষার্থী চাকরিও পাবে না—কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
এই জায়গাতেই সরকারের দায়িত্ব নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, দক্ষ জনশক্তি, উদ্ভাবক, গবেষক, পেশাজীবী এবং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। এখনই এই উদ্যোগ শুরু করা না গেলে জনমিতিক সুবিধা একসময় সম্ভাবনার বদলে অর্থনৈতিক চাপেও পরিণত হতে পারে।
কর্মসংস্থানের সংকট শুধু চাকরির অভাব নয়, সঠিক দিকনির্দেশনারও সংকট
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের বাস্তব পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ছিল অনেক কম। একই বিশ্লেষণে ২০২৩ সালে তরুণদের বেকারত্বের হার ৮ শতাংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে তা ১৪ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
World Bank Blogs
এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরও যদি একজন শিক্ষার্থী উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে না পান, তাহলে সমস্যাটি কি শুধু চাকরির সংখ্যা কম হওয়ার? নাকি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, কর্মবাজার সম্পর্কে ধারণা, পেশা নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগেও ঘাটতি রয়েছে?
বাস্তবতা হলো, সমস্যাটি বহুমাত্রিক। একদিকে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যেন তাঁরা পরিবর্তনশীল কর্মবাজারের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁদের সামনে বিকল্প পেশাগত পথের সুযোগও উন্মুক্ত করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই জানতে পারেন, তাঁর আগ্রহ কোন ক্ষেত্রে, কোন ধরনের দক্ষতা অর্জন করলে কর্মবাজারে ভালো করবেন, কোন শিল্পখাতে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে এবং কীভাবে নিজের পেশাগত পরিচিতি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে তাঁর প্রস্তুতি অনেক বেশি কার্যকর হবে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ শুরু হয় পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর, যখন সময়, অর্থ এবং পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ একসঙ্গে এসে পড়ে।
ফলে অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নেন, অথচ তাঁদের বিকল্প পরিকল্পনা থাকে না। কেউ আবার নিজের আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কেউ জানেন না, তাঁর অর্জিত জ্ঞান দিয়ে কী ধরনের কাজ করা সম্ভব। আবার অনেকে চাকরির আবেদন করতে গিয়ে বুঝতে পারেন, তাঁদের যোগাযোগ, উপস্থাপনা, সমস্যা সমাধান কিংবা ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংকে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির মৌলিক অবকাঠামো।
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কেন স্কুল থেকেই শুরু হওয়া প্রয়োজন
আমাদের দেশে ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে শুরু হয়। কোথায় চাকরি পাওয়া যাবে, কীভাবে সিভি তৈরি করতে হবে, কীভাবে ইন্টারভিউ দিতে হবে—এসব বিষয়ে তখন কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু একটি কার্যকর ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তৈরির জন্য এই সময়টুকু যথেষ্ট নয়।
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং শুরু হওয়া উচিত মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়সেই একজন শিক্ষার্থীকে জীবনের চূড়ান্ত পেশা বেছে নিতে হবে। বরং তাঁকে নিজের আগ্রহ, সামর্থ্য, মূল্যবোধ এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে জানার সুযোগ দিতে হবে। বিজ্ঞান, ব্যবসা, প্রযুক্তি, সৃজনশীল শিল্প, কৃষি, গবেষণা, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা কারিগরি পেশা—প্রতিটি ক্ষেত্র সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী হয়তো গণিতে ভালো, কিন্তু সে উদ্যোক্তা হতে চায়। আরেকজন হয়তো সাহিত্যে আগ্রহী, কিন্তু ডিজিটাল কনটেন্ট, গণযোগাযোগ কিংবা ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনায় নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পেতে পারে। কেউ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চায়, কেউ মানুষের সমস্যা সমাধানে আগ্রহী, কেউ আবার হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সবার জন্য একই ধরনের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে না।
এ কারণেই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ক্যারিয়ার কাউন্সেলর অথবা অনুমোদিত ক্যারিয়ার গাইডেন্স ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও দক্ষতা মূল্যায়ন, বিভিন্ন পেশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা, পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ জানানো এবং ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা হবে এই ব্যবস্থার কাজ।
এখানে অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। অনেক সময় শিক্ষার্থীর আগ্রহের পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদা, আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা কিংবা পরিচিত পেশার নিরাপত্তা বিবেচনা করে ক্যারিয়ার নির্ধারণ করা হয়। একজন শিক্ষার্থী চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা সরকারি কর্মকর্তা হতে না চাইলে তাঁকে ব্যর্থ ভাবার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন দক্ষ ডিজাইনার, কৃষি-প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, গবেষক, দক্ষ কারিগর কিংবা সফল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
সরকার চাইলে জাতীয় পর্যায়ে একটি ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাঠামো তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একই মৌলিক নির্দেশনা অনুসরণ করবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পেশার তথ্য, দক্ষতার চাহিদা, প্রশিক্ষণের সুযোগ, বৃত্তি, ইন্টার্নশিপ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারবে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা দেওয়া।
চাকরিপ্রার্থী তৈরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চাই
বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ তৈরি করতে হলে প্রথমেই আমাদের একটি মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যবসা শুরু করাকে যেন শুধু বড় পুঁজি, পারিবারিক সম্পদ কিংবা বিশেষ সামাজিক যোগাযোগসম্পন্ন মানুষের কাজ হিসেবে দেখা না হয়। উদ্যোক্তা হওয়া মানে একটি সমস্যা শনাক্ত করা, তার কার্যকর সমাধান তৈরি করা এবং সেই সমাধানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।
একজন শিক্ষার্থী স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার নতুন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন। আরেকজন শিক্ষার্থী ছোট ব্যবসার হিসাবরক্ষণ সহজ করতে সফটওয়্যার বানাতে পারেন। কেউ শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত অনলাইন শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে পারেন, কেউ স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার উদ্যোগ নিতে পারেন, আবার কেউ পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান তৈরি করতে পারেন। এসব উদ্যোগের প্রতিটিই উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাব্য পথ।
উদ্যোক্তা তৈরির জন্য শুধু ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। প্রকৌশল, বিজ্ঞান, কৃষি, চিকিৎসা, সমাজবিজ্ঞান, মানবিক এবং চারুকলার শিক্ষার্থীদেরও উদ্ভাবন ও ব্যবসার মৌলিক ধারণা দিতে হবে। কারণ, নতুন ব্যবসার ধারণা অনেক সময় এমন মানুষের কাছ থেকেই আসে, যিনি কোনো নির্দিষ্ট সমস্যাকে কাছ থেকে দেখেছেন এবং সেটি সমাধানের প্রয়োজন অনুভব করেছেন।
সরকারের উচিত মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বয়স ও শিক্ষাস্তর অনুযায়ী উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা। এই শিক্ষা হবে বাস্তবভিত্তিক। শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে একটি সমস্যা শনাক্ত করতে হয়, বাজার যাচাই করতে হয়, সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে হয়, ব্যবসার প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়, খরচ ও আয় হিসাব করতে হয় এবং একটি ধারণাকে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করতে হয়।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। বরং উদ্যোক্তা শিক্ষার মাধ্যমে তাঁরা উদ্যোগ গ্রহণ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা অর্জন করবে। এসব দক্ষতা চাকরি, গবেষণা এবং অন্যান্য পেশাতেও কাজে লাগবে।
এখানে সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে: উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ মানেই সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ঠেলে দেওয়া নয়। বরং শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি বুঝতে শেখানো, সম্ভাব্য ক্ষতি মূল্যায়ন করা, আইনগত বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জানা এবং দায়িত্বশীলভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই প্রকৃত উদ্যোক্তা শিক্ষার উদ্দেশ্য।
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সুযোগ আছে, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা আরও কার্যকর করতে হবে
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত ইতিমধ্যে সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনে রূপান্তর করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা আরও সহজলভ্য করতে হবে।
লাইটক্যাসল পার্টনার্সের Bangladesh Startup Investments Report 2024: A Year in Review অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো প্রায় ৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই বছরে মোট স্টার্টআপ বিনিয়োগের ৯৮ শতাংশ এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
LightCastle Partners
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, স্টার্টআপ খাতে সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়নের উৎস, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা এবং স্থানীয় পুঁজির অংশগ্রহণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথম কোনো উদ্যোগের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর পক্ষে প্রচলিত বিনিয়োগকারীর কাছে যাওয়ার মতো প্রস্তুতি বা অভিজ্ঞতা থাকা কঠিন।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বাজারের সম্ভাবনা, প্রতিষ্ঠাতার সক্ষমতা, ব্যবসার মডেল, গ্রাহকের চাহিদা, আয় তৈরির পথ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন করে থাকেন। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী তাঁর প্রথম উদ্যোগে এসব বিষয়ে কতটা জানবেন? তাঁর প্রয়োজন হতে পারে একজন অভিজ্ঞ মেন্টর, বাজার যাচাইয়ের জন্য সামান্য অর্থ, একটি কাজের জায়গা, প্রযুক্তিগত সহায়তা কিংবা ব্যবসার হিসাব ও আইনগত কাঠামো সম্পর্কে পরামর্শ।
এই পর্যায়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের চেয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ছোট পরিসরে পরীক্ষা করার সুযোগ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
সরকারের উচিত শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ধারাবাহিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ধারণা যাচাই, প্রোটোটাইপ তৈরি, গ্রাহক পরীক্ষা, মেন্টরশিপ এবং প্রাথমিক অনুদানের সুযোগ থাকবে। যেসব উদ্যোগ বাস্তব সম্ভাবনা দেখাবে, সেগুলো পরবর্তী পর্যায়ে ঋণ, বিনিয়োগ অথবা অন্যান্য উপযুক্ত অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
এই ব্যবস্থায় অনুদান ও বিনিয়োগকে এক করে দেখা যাবে না। অনুদান হতে পারে গবেষণা, প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য; অন্যদিকে ইকুইটি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ দিতে হয় এবং ঋণের ক্ষেত্রে পরিশোধের দায় থাকে। শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই এই পার্থক্য বুঝতে শেখানো জরুরি।
সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও থাকতে হবে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। কোনো শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা সুপারিশ যেন সহায়তা পাওয়ার প্রধান শর্ত না হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত সমস্যার গুরুত্ব, উদ্যোগের বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠাতার সক্ষমতা এবং অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি।
বাংলাদেশের সরকারি স্টার্টআপ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রকাশিত একটি রোডম্যাপে অ্যাক্সিলারেটর ও ইনকিউবেটর, চ্যালেঞ্জ ফান্ড, স্থানীয় বিনিয়োগকারী সম্পৃক্ততা, ফান্ড ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সংস্কারের মতো বিষয়কে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
Startup Bangladesh Limited
এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা গেলে উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়া কেবল কয়েকটি শহর বা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও উদ্ভাবন, মেন্টরশিপ এবং প্রাথমিক অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় হবে শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখা। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ যখন কর্মজীবনে প্রবেশের সময় বাস্তব অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পায় না, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মবাজারের মধ্যকার দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একজন শিক্ষার্থী চার বছর ব্যবসায় প্রশাসন পড়ার পরও যদি একটি ব্যবসার মৌলিক আর্থিক হিসাব তৈরি করতে না পারেন, একজন গণযোগাযোগের শিক্ষার্থী যদি পেশাদার প্রতিবেদন লিখতে বা কার্যকর উপস্থাপনা করতে সমস্যায় পড়েন, কিংবা একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যদি বাস্তব গ্রাহকের সমস্যা সমাধানে নিজের দক্ষতা প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে শুধু পাঠ্যক্রম শেষ করাকে সফল শিক্ষা বলা যায় না।
অবশ্যই সব শিক্ষার্থী একই দক্ষতায় পারদর্শী হবেন না। শিক্ষার উদ্দেশ্যও সবাইকে একই ধরনের কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা নয়। কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব বিষয়ের জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের নিয়মিত ক্লাস, কর্মশালা, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং মেন্টরশিপে যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে কাজ করবে, শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা তাদের কাজ মূল্যায়ন করবেন এবং ভালো কাজের জন্য ইন্টার্নশিপ বা চাকরির সাক্ষাৎকারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার সেন্টারগুলোকে শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, সিভি তৈরি, LinkedIn প্রোফাইল উন্নয়ন, সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, পেশাগত যোগাযোগ, কর্মক্ষেত্রের আচরণ, বেতন আলোচনা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে স্টুডেন্ট স্টার্টআপ ক্লাব, ইনোভেশন ল্যাব, উদ্যোক্তা মেন্টরিং সেল এবং প্রাথমিক ব্যবসায়িক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব উদ্যোগকে কেবল আনুষ্ঠানিক সংগঠন হিসেবে না রেখে শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশনের আগে অন্তত একটি বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকা উচিত। সেটি ইন্টার্নশিপ হতে পারে, গবেষণা প্রকল্প হতে পারে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে, সামাজিক উদ্যোগ হতে পারে কিংবা নিজের স্টার্টআপের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা চাকরি ও উদ্যোক্তা—উভয় পথেই শিক্ষার্থীকে এগিয়ে রাখবে।
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের সরাসরি সংযোগ থাকতে হবে
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু একজন শিক্ষার্থীকে কোন পেশায় যাওয়া উচিত, তা বলে দেওয়া নয়। তাঁকে সেই পেশার জন্য প্রস্তুত হওয়ার বাস্তব পথও দেখাতে হবে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান। তাঁকে শুধু এই পেশার চাহিদা সম্পর্কে জানালে হবে না। তাঁকে বুঝতে হবে কীভাবে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন পরিকল্পনা করতে হয়, কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, কীভাবে গ্রাহকের আচরণ বুঝতে হয় এবং কীভাবে নিজের কাজের ফলাফল পরিমাপ করতে হয়। একইভাবে একজন উদ্যোক্তা হতে চাইলে তাঁকে বাজার গবেষণা, গ্রাহক যাচাই, আর্থিক পরিকল্পনা, বিক্রয়, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
এখানে একটি জাতীয় ডিজিটাল ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগ্রহ, দক্ষতা এবং পেশাগত লক্ষ্য অনুযায়ী উপযুক্ত কোর্স, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও মেন্টরের তথ্য পাবে। বিভিন্ন শিল্পখাতে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোন পেশায় কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন এবং কোন প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানে সহায়তা করতে পারে—এসব তথ্যও সেখানে নিয়মিত হালনাগাদ করা যেতে পারে।
তবে এই প্ল্যাটফর্ম শুধু অনলাইন তথ্যভান্ডার হলে চলবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরাসরি কাউন্সেলিং, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ক্যারিয়ার সেবা এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও থাকতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু ঢাকায় বসবাস করেন না বলে পিছিয়ে না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ভিত্তিক ক্যারিয়ার টুলও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজের দক্ষতার ঘাটতি শনাক্ত করতে, শেখার পরিকল্পনা তৈরি করতে এবং বিভিন্ন পেশার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তির পরামর্শকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশেষভাবে নিশ্চিত করতে হবে, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং যেন কোনো ব্যয়বহুল বেসরকারি সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে এই সেবা নিশ্চিত করা উচিত।
নারী শিক্ষার্থী ও প্রান্তিক তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে
উদ্যোক্তা উন্নয়নের আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুবিধা দেশের সব শ্রেণির তরুণের কাছে পৌঁছাবে। ঢাকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যেমন সুযোগ পাবেন, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে ছিলেন বলে সে সময়ের হিসাব উল্লেখ করা হয়। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ছিলেন নারী। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক সরকারকে সহায়তা করতে ৯ লাখ গ্রামীণ তরুণের দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তার জন্য ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি অর্থায়ন চুক্তির কথা জানায়।
World Bank
এই তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু শহরকেন্দ্রিক উদ্যোগ দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রামীণ তরুণদের জন্য স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষি প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র উৎপাদন, স্থানীয় পর্যটন, ডিজিটাল সেবা এবং অনলাইন বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। অনেক নারী উদ্যোক্তা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক দায়িত্ব, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, অর্থায়ন এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে প্রবেশের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। তাই তাঁদের জন্য নিরাপদ প্রশিক্ষণ, নমনীয় সময়সূচি, অনলাইন মেন্টরশিপ, আর্থিক সাক্ষরতা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার সেবায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক সক্ষমতা, পারিবারিক আয় কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান যেন তাঁর প্রতিভা বিকাশের পথে অপ্রয়োজনীয় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
সরকারের প্রতিটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিতে নারী, গ্রামীণ তরুণ এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা উচিত। তবে শুধু অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; তাঁদের উদ্যোগ কতটা টিকে থাকছে, আয় তৈরি করতে পারছে কি না এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় স্টুডেন্ট স্টার্টআপ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি জাতীয় স্টুডেন্ট স্টার্টআপ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এই কর্মসূচি হবে শিক্ষার্থী থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে বাজারে প্রবেশ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা পাওয়া যাবে।
এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে শুরুতেই নিবন্ধিত কোম্পানির মালিক হতে হবে না। বরং শিক্ষার্থীরা দল গঠন করে একটি সমস্যা চিহ্নিত করবে, সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলবে এবং সমাধানের প্রাথমিক ধারণা তৈরি করবে। এরপর নির্বাচিত দলগুলো প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং প্রোটোটাইপ তৈরির সুযোগ পাবে।
যেসব দল তাদের ধারণার বাস্তব সম্ভাবনা প্রমাণ করতে পারবে, তারা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ছোট অঙ্কের প্রাথমিক অনুদান পেতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে তাদের জন্য ইনকিউবেশন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং বাজারে প্রবেশের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, আইসিটি বিভাগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে দায়িত্বভিত্তিক সমন্বয় প্রয়োজন হবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে একই কাজ করতে না দিয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিটি বিভাগে সমানসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং স্থানীয় চাহিদা, উদ্ভাবনের মান এবং বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে উদ্যোগ নির্বাচন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মেন্টর দিতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কাজের সুযোগ দিতে পারে, আর সরকার নীতিগত সহায়তা, প্রাথমিক অর্থায়ন এবং জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করতে পারে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের প্রথম উদ্যোগে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সব ধারণা সফল হবে না, সব ব্যবসা টিকে থাকবে না। তাই প্রতিটি ব্যর্থতাকে দুর্নীতি বা অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। তবে অর্থের অপব্যবহার, ভুয়া তথ্য কিংবা ইচ্ছাকৃত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও কোনো উদ্যোগ বাজারে সফল না হলে, সেখান থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের চাকরি, উদ্যোক্তা ও বিকল্প ক্যারিয়ারের মধ্যে সেতুবন্ধন
ক্যারিয়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা সংশোধন করতে হবে। চাকরি এবং উদ্যোক্তা হওয়াকে পরস্পরের বিপরীত দুটি পথ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। একজন শিক্ষার্থী প্রথমে চাকরি করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, পরে নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারেন। কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন। আবার কেউ চাকরির পাশাপাশি ছোট উদ্যোগ বা গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পেও যুক্ত হতে পারেন, যদি তা তাঁর চাকরির নীতি ও আইনগত বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে, ক্যারিয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা। এর মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হতে পারে, এমনকি পেশা পরিবর্তনের প্রয়োজনও হতে পারে। তাই তাঁদের শুধু প্রথম চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের দক্ষতা হালনাগাদ রাখার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার সেন্টারগুলো সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে। অভিজ্ঞ অ্যালামনাইরা বর্তমান শিক্ষার্থীদের মেন্টর হিসেবে কাজ করতে পারেন, কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপ বা চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জানাতে পারেন। তবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে হতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরি মেলা, স্টার্টআপ মেলা, ক্যারিয়ার সপ্তাহ, পেশাভিত্তিক আলোচনা এবং উদ্যোক্তা সম্মেলনের আয়োজন করা যেতে পারে। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু অনুষ্ঠান করা নয়; শিক্ষার্থীকে বাস্তব সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা।
বিশেষ করে নিয়োগদাতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, কোন প্রশিক্ষণ কার্যকর হচ্ছে এবং কোন পেশায় নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সে সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। সেই তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার কার্যক্রম উন্নত করতে পারবে।
সরকারি উদ্যোগের সাফল্য মাপতে হবে বাস্তব ফলাফলে
বাংলাদেশে অনেক সময় নতুন প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারণ করা হয় কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, কতটি কর্মশালা হয়েছে কিংবা কতটি সনদ দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে। কিন্তু শিক্ষার্থী উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব তথ্য একা যথেষ্ট নয়।
কোনো কর্মসূচিতে এক হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিলেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশিক্ষণের ছয় মাস বা এক বছর পর তাঁদের কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজন ইন্টার্নশিপ করেছেন, কতজন নতুন উদ্যোগ শুরু করেছেন, কতজনের আয় বেড়েছে এবং কতজন নতুন দক্ষতা বাস্তবে কাজে লাগাতে পেরেছেন, সেসব তথ্যও প্রয়োজন।
একইভাবে শিক্ষার্থীদের স্টার্টআপ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতটি ব্যবসা নিবন্ধিত হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। উদ্যোগগুলো কত দিন টিকে আছে, নিয়মিত গ্রাহক তৈরি করতে পারছে কি না, কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, কতটা রাজস্ব তৈরি হচ্ছে এবং সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে কতটা অবদান রাখছে, তা মূল্যায়ন করতে হবে।
সরকারের উচিত এসব কর্মসূচির জন্য একটি স্বচ্ছ ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা। নির্দিষ্ট সময় পর স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে কার্যকর কর্মসূচিগুলো সম্প্রসারণ এবং দুর্বল কর্মসূচিগুলোর নকশা সংশোধন করতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যারিয়ার মূল্যায়ন বা দক্ষতা পরীক্ষার তথ্য যেন অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয় কিংবা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের কারণ না হয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
এখনই বিনিয়োগ করতে হবে বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনায়
বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপান্তরিত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর সহায়তা।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করার অর্থ এই নয় যে, সবাইকে ব্যবসায়ী হতে হবে। বরং তাঁদের এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তাঁরা সমস্যা দেখলে সমাধানের কথা ভাববেন, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ রাখবেন, দায়িত্ব নিতে শিখবেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেবেন।
একইভাবে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়ার পথ দেখানো নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিজের সামর্থ্য বুঝতে সাহায্য করা, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ তৈরি করা।
সরকার যদি এখনই এই দুটি বিষয়কে জাতীয় অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও কর্মমুখী হবে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি পাবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাও বাড়বে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় অবকাঠামো, শিল্পকারখানা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন দেশের তরুণেরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করার সুযোগ পান, সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করতে পারেন এবং নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারেন।
আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্ভাবক, শিল্পনেতা এবং নীতিনির্ধারক। তাঁদের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা কোনো বিচ্ছিন্ন শিক্ষাপ্রকল্পের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নির্মাণের প্রশ্ন।
অতএব, শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্যোক্তা শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং চালু করা আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই। এখনই প্রয়োজন সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সম্মিলিত উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য নয়, জীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণদের সামনে শুধু একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি নয়, সম্ভাবনার একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী খুলে দিতে হবে। কেউ যেন দিকনির্দেশনার অভাবে নিজের প্রতিভা হারিয়ে না ফেলেন, কেউ যেন সুযোগের অভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ না করেন, আর কেউ যেন ভুল ক্যারিয়ার পরিকল্পনার কারণে বছরের পর বছর পিছিয়ে না পড়েন। আজকের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই আগামী দিনের কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
লেখক: মীর হাসিব মাহমুদ - সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়। সিইও লিড নেশন একাডেমি। পরামর্শক, ট্রান্সফোটেক একাডেমি।